June 13, 2026, 4:28 am
তানজিন জাহান ইভা: কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে মেগাসিটি ঢাকার জনজীবন বিপর্যস্ত। কদিন ধরে তাপমাত্রা থার্মোমিটারের ঘরে ৩৭ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছড়ালেও, বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে নাগরিক জীবনে অনুভূত হচ্ছে ৪৫ ডিগ্রিরও বেশি হাঁসফাঁস গরম। তবে আবহাওয়াবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার এই ফুটন্ত কড়াইয়ে রূপ নেওয়ার পেছনে কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে শহরের সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও পরিবেশগত আত্মহননের ইতিহাস।
১. ‘হিট আইল্যান্ড’ এবং ঢাকার কংক্রিট-বাস্তবতা
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, মৌসুমি বায়ু আসার ঠিক আগমুহূর্তে বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে এই তীব্র অস্বস্তি। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন প্রকৃতির ওপর দায় চাপাচ্ছেন, পরিবেশ বিজ্ঞানীরা তখন আঙুল তুলছেন ঢাকার ভূপ্রকৃতির দিকে।
ঢাকা এখন একটি পুরোদস্তুর ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা ‘নগুরে তাপীয় দ্বীপ’। গত দু-তিন দশকে ঢাকা থেকে গাছপালা, উন্মুক্ত জলাশয় এবং খেলার মাঠ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। যে ঢাকা একসময় জলাভূমি ও সবুজে ঘেরা ছিল, তা এখন বহুতল ভবন আর পিচঢালা সড়কের এক ধূসর জঙ্গল। এই কংক্রিট এবং আলকাতরার রাস্তা দিনের বেলা সূর্যের তাপ শুষে নেয় এবং রাতে তা বাতাসে ছাড়ে। ফলে রাতের ঢাকাও এখন আর জুড়াতে পারছে না।
২. শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজির সংকট
তাপদাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে সমাজের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর। রিকশাচালক, দিনমজুর, হকার ও নির্মাণ শ্রমিকদের জীবিকা স্থবির হয়ে পড়েছে।
”দুপুরে রিকশা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। শরীর মনে হয় পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো পেট চলবে না।” — রহিম মিয়া (৪৫), রিকশাচালক, মিরপুর।
দুপুরের দিকে তীব্র রোদের কারণে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় এই দৈনিক আয়ের মানুষদের আয় নেমে এসেছে অর্ধেকে। এর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডায়রিয়া, হিট স্ট্রোক এবং পানিশূন্যতার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা ঢাকার হাসপাতালগুলোর আইসিইউ ও সাধারণ বেডের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
৩. এসি বনাম সাধারণ মানুষের বৈষম্য
ব্যাখ্যামূলকভাবে দেখলে, এই গরম ঢাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকেও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলছে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কৃত্রিম শীতলতার জন্য এসি (Air Conditioner) ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এর পরিণতি হচ্ছে মারাত্মক।
হাজার হাজার এসি থেকে নির্গত গরম বাতাস ঢাকার বাইরের পরিবেশকে আরও তপ্ত করে তুলছে। অর্থাৎ, ঘরের ভেতরকে ঠান্ডা রাখতে গিয়ে ঢাকার ধনিক শ্রেণী বাইরের বাতাসকে আরও উত্তপ্ত করছে, যার সরাসরি শিকার হচ্ছে সাধারণ পথচারী ও বস্তিবাসী।
৪. বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের দ্বিমুখী সমস্যা
তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড ছুঁয়েছে। আর এর ফলেই শুরু হয়েছে অনিয়মিত লোডশেডিং। বিশেষ করে ঢাকার প্রান্তিক ও উপশহর এলাকাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। একদিকে প্রকৃতির তাপদাহ, অন্যদিকে যান্ত্রিক শীতলতার অভাব—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ নাগরিক।
সংকট উত্তরণের পথ কী?
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, শুধু বৃষ্টির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকলে ঢাকার এই সংকট কাটবে না। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান না খুঁজলে ঢাকা অদূর ভবিষ্যতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। জরুরি কিছু পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে:
1) সবুজায়ন (Urban Greening): প্রতিটি ভবনের ছাদে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা এবং ঢাকার চারপাশের নদী ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করা।
2) জলাশয় রক্ষা: ‘নগর জলাশয় সংরক্ষণ আইন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে কৃত্রিম লেক ও পুকুর বাড়ানো।
পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য: এমন ভবনের নকশা করা যা প্রাকৃতিকভাবে আলো-বাতাস চলাচলের উপযোগী এবং কম তাপ শোষণ করে।
পরিশেষ:ঢাকায় মাঝে মাঝে হওয়া স্বস্তির বৃষ্টি হয়তো সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমিয়ে আনবে, কিন্তু যে কাঠামোগত ক্ষত এই শহর নিজের গায়ে মেখেছে, তার স্থায়ী চিকিৎসা না হলে প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল ঢাকার জন্য এক একটি মানবিক বিপর্যয় হয়েই ফিরে আসবে।
Leave a Reply